স্মৃতিচারণ

ক্লাস টু-র মার্জিয়া

ক্লাস টু-তে পড়ার সময় অনেকদিন পর্যন্ত আমার পাশের ডেস্কে বসতো মার্জিয়া। ছোট বাচ্চাদের ক্লাসে যেমন হয়, আলাদা আলাদা ডেস্ক-টুলে বসে সবাই, বেঞ্চ ভাগাভাগির আনন্দটা নেই। তবু ওর সঙ্গে আমার অন্যরকম বন্ধুত্ব হয়ে গেলো। এর কারণ দু'টো। প্রথমতঃ খাতাটা একটু কোণাকুণি করে না ধরলে ঠিকমতো লিখতে পারতাম না, তাই বসতামও সেভাবে; বাঁ দিকে বসা মার্জিয়ার কর্মকাণ্ডের খুব কমই আমার নজর এড়াতো। দ্বিতীয়তঃ ভোরের অ্যাসেম্বলি শুরুর আগে,টিফিন পিরিয়ডে, কিংবা ছুটির পর ও আমাকে অনেক কিছু শেখাতো। কোন্ আঙ্গুলে আড়ি আর কোন্ আঙ্গুলে ভাব হয়, জন্মের আড়ি দিলে আর ভাব করা যায় কিনা- শিশুকালের এমন সব গুরুত্বপূর্ণ রীতিরেওয়াজের হাতেখড়ি আমার ওর কাছেই। শৈশবকালীন রিচুয়াল বিষয়ে বান্ধবীর অজ্ঞতায় সে খুবই বিরক্ত হতো, চট্টগ্রামের আঞ্চলিক প্রভাবযুক্ত উচ্চারণে "তুমি জানোনা যে..." বলে আবার খুশী মনে সেটার ব্যাখ্যা দিতো। হাসপাতাল থেকে আম্মু ওর জন্য ভাইয়াবাবু নিয়ে আসবে, ওর সাত বছরের জন্মদিনে ওদের বাসায় লাইটিং করা হবে- এই দু'টো গল্প বার বার করতো।

একদিন আমাদের ইংরেজি বানান আর শ্রুতিলিখনের ক্লাসটেস্ট হলো, পরীক্ষার পর টিচার ঠিক করলেন

একদিন সবকিছু গল্প হয়ে যায় ০৬

ব্যস্ত স্বল্পায়ু দিন, নির্ঘুম দীর্ঘ রাত--- সবার কোটা একে একে শেষ হয়ে আসে। যাদের দেখার কথা ছিল, সবাইকে দেখেছি কি? করার ছিল যা, করেছি কি সব? হিসেব মেলেনা। পরীক্ষার অংকে ভাল নম্বর জুটলেও জীবনের অংকে বরাবরের মতো কাঁচাই রয়ে গেলাম। উপচে আসা জলস্রোতের সঙ্গে যুদ্ধরত চোখগুলোর দিকে তাকাতে পারিনা; গ্রহণ-লাগা সূর্য দেখাও বুঝিবা সহজ এর চেয়ে।

কতবার ঘর ছেড়েছি, কত কতো বার, তবু প্রতিবার বুকের গভীরে সেই শব্দটা ফিরে ফিরে আসে। আদিগন্ত প্রান্তরে আশ্বিনের বাতাসের শব্দ, সর্বগ্রাসী নদীর পাড় ভাঙার শব্দ। আর কেউ কি শুনতে পায়? আমার কোলে মাথা রেখে ছবির বই দেখা নির্বিকার অপনাকে দেখে হতাশ হতে হতেও আশ্বস্ত হই। সংবেদনশীলতার বড় যন্ত্রণা মা; নির্বোধের বরং সান্ত্বনা অনেক।

মোড়কবন্দী করার পর সন্দেহজনক অস্ত্রের চেহারা নেয়া দোতারার খাজনা দিতে দিতে বন্দরে বন্দরে ঘাটের পর ঘাট পেরোই। ভেতরের হাহাকার চাপা পড়ে যায় নিরাপদ যাত্রার যাবতীয় আনুষ্ঠানিকতার তুচ্ছতায়। শেষরাতের থাইল্যান্ডের আকাশে পাড়ি দেয়ার মুহূর্তে আকাশ ভেঙে অকালবর্ষণ নামে। একচিলতে জানালার বাইরে রানওয়ের সারি সারি আলো বৃষ্টিধারায় ধুয়েমুছে লেপ্টে যায় ...

একদিন সবকিছু গল্প হয়ে যায় ০৫

শেল্ফে নতুন বই এসেছে কিছু; টেবিলের ওপর একগাদা "কালি ও কলম"এর লোভনীয় হাতছানি (আক্ষরিক অর্থে নয়; চোখকাড়া এক সাহিত্য পত্রিকা)। হাসান আজিজুল হক- মাহমুদুল হকদের রিভিশন দিয়ে ফেলব; দেশে ফেরার পথে এমন কিছু ভেবেছিলাম। হলোনা।

একটু গুছিয়ে নেয়ার আগেই এক তুতো-বোনের বিয়ের ঝামেলা শুরু হয়ে গেল। পাত্রপাত্রী নিজেরাই নিজেদের খুঁজে নিয়ে প্রেম করেছে সর্বাধুনিক আন্তর্জালিক ঘরানায়। পক্ষবিপক্ষ অবস্থানের অভিভাবকদের যাবতীয় টেলিফোনিক বা সশরীরী সভাসমিতির প্রধান কার্যালয় আমাদের বাসা। মজা দেখতে গিয়ে একসময় আমি গভীর বিস্ময়ে সেইখানে নিজেকে একজন গুরুত্বপূর্ণ মুরুব্বী-আন্ডার-কন্সট্রাকশন হিসেবে আবিষ্কার করলাম। লাখখানেক কথাবার্তা চালাচালির পর জানা গেল প্রবাসী রাজপুত্তুরটি দেশে ফিরেছে একমাসের জন্য এবং পাত্রের পরিবার এই চট্টগ্রাম শহরেই থাকে; কাজেই এখানেই হবে সে বিয়ে। সবাই যার যার কাজেকর্মে ব্যস্ত; আমার মতো "ছুটিকাটানো" বেকার আর কেউ নেই। ফলে যা হবার কথা তাই হল, আয়োজনের দৌড়াদৌড়ির দায়িত্ব এসে পড়ল এই অনতিইচ্ছুক ঘাড়ে।

একদিন সবকিছু গল্প হয়ে যায় ০৪

এই শহরে জীবনের অনেকটাই কেটেছে আমার; তবু বাইরে বেরিয়ে হঠাৎ হঠাৎ পথ হারিয়ে ফেলি। ব্যস্ত রাস্তার দু'ধারে আকাশ ঢেকেছে নির্মীয়মান ভবনের অচেনা সারি; চেনাজানা বাঁকেমোড়ে বেমালুম অদৃশ্য হয়ে গেছে কিছু আইকনিক বৃক্ষ-স্থাপনা- সাইনবোর্ড। আবার কোথাও তেমন কাউকে খুঁজে পেয়ে অদ্ভুত এক স্বস্তিবোধে আচ্ছন্ন হই। সিআরবি মোড়ে পাহাড়ের ঢালে সারবাঁধা রেইনট্রিদের দেখতে যাই। নির্জন শতবর্ষী বৃক্ষের বিশালদেহে আশ্রয়ী অর্কিডের ঝাড় দুলে উঠে জানান দেয়, আমরা এখনো আছি।

একদিন সবকিছু গল্প হয়ে যায় ০৩

আব্বু, আমার চিরচেনা ভয়ংকর রুদ্রমূর্তি বাবা, তাকেই দেখছি তো? এতো বুড়িয়ে গেলেন কবে? দাড়ি রাখলেন কবে থেকে? আশৈশব গড়ে ওঠা দূরত্ব এসব প্রশ্নকে অনুচ্চারিতই রেখে দেয়। জানালার কাঁচ নামিয়ে ছুটে চলা চট্টলার ভোরের বাতাসে শ্বাস নিই। এই শহর জানে আমার প্রথম সবকিছু।

বাসায় যাওয়ার পথে খেয়াল করলাম ড্রাইভার ছোকরাকে বাবা যাই বলছেন, সে তার উল্টোটা করছে। আস্তে চালাতে বললে সামনে স্পিডব্রেকার দেখেও গতি বাড়িয়ে দিচ্ছে, বাঁয়ে পার্ক করতে বললে উল্টো ঘুরে ডানে রাখছে। কাঁটা হয়ে বসে বাজখাঁই কণ্ঠের ধমকের অপেক্ষায় রইলাম, তেমন কিছুই শোনা গেলো না। কোনও একটা ঘটনা আছে, সন্দেহ থেকে প্রশ্নটা করেই ফেলি। রিটায়ার করে ফেলেননিতো? সংক্ষিপ্ত উত্তর এল, হুঁ। এখানেও ঘটনা আছে নিশ্চিত। সুস্থ-সবল মানুষ, সরকারী চাকরি থেকে অবসর নিয়ে বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করছিলেন কয়েক বছর ধরে। রীতিমতো আকর্ষণীয় প্যাকেজের একটা চাকরি; কাজের চাপও ছিলনা তেমন। তবে??? কঠিন কোন উত্তর শোনার অথবা কঠিন মানুষটাকে আঘাত দেয়ার সম্ভাবনা থাকায় এ প্রশ্নটাও চেপে যাই।

সাম্প্রতিক মন্তব্য