||১||
ছোটবেলায় গ্রামের বাড়ী বেড়াতে গেলে প্রতিবেশী রমামাসীর বাড়ীতে বেশ যাওয়া হতো, মাসীর ছোটমেয়ে আমার সমবয়সী ছিলো। আশির দশকের গোড়ার দিকে মাসী ছিলো স্বাস্থ্য অথবা ফ্যামিলি প্ল্যানিং অধিদফতরের মাঠকর্মী, তার ঘরজুড়ে বিচিত্র সব পোস্টার, ক্যালেন্ডার, প্রচারপত্র ইত্যাদি হাবিজাবি। ছেলে হোক মেয়ে হোক দু'টি সন্তানই যথেষ্ট, প্রেসিডেন্ট জিয়া নাকি সাত্তার কার বাণী, সঙ্গে দুই পুত্রকন্যাসহ হাস্যমুখ গ্রাম্য কৃষক-গৃহিণীর ছবি। এখন যেমন এসএমসি, সেসময় জন্মনিরোধকের চালু কোম্পানী ছিলো, নামটা যতদূর মনে পড়ে, অর্গ্যানন বাংলাদেশ লিমিটেড। প্রোডাক্টের ছবিঅলা ক্যালেন্ডার আর পোস্টারের নীচে সেই নাম থাকতো। ওইটুকু বয়সে এসব কিছুর মানে বোঝার কারণ নেই, চোখের সামনে বাংলা অক্ষরে লেখা সবকিছুই পড়া চাই, আর আমাদের বোধবুদ্ধিতে ওগুলো ছিলো ঔষধ, বড়রা খায়।
সেই রমামাসী গ্রামে ঘুরে ঘুরে মহিলাদের পরিবার পরিকল্পনার গুরুত্ব বোঝাতো। স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা হাসপাতালে (তখন কোথায় কেমন ব্যবস্থা ছিলো জানি না) মাঝেমধ্যে ক্যাম্প বসতো, সেখানে গ্রামের মহিলারা যেতো চারপাশে কাপড় দিয়ে ঘেরা রিকশায় চড়ে। কোন কোন দিন দুপুরবেলা জনাকয়েক মহিলা আসতো রমামাসীর কাছে, কেউ উপদেশ নিতে, কেউ অভিযোগ জানাতে। মাটির মেঝে বেড়ার দেয়ালের ওপর টিনের চালার একটাই ঘর, এক কোণায় বসে খেলতে খেলতে তাদের কথাবার্তার কিছুটা আমাদের কানেও ঢুকতো।
সেইসব মহিলাদের বেশীরভাগের মুখে যে কথা শোনা যেতো তা হলো "মাথা ঘুরে লো রমা!"। পুকুরঘাট বা পাকঘরে নিত্যদিনের যাওয়া আসার পথে কিংবা ঢেঁকিতে পাড় দিতে গিয়ে মাথা ঘুরে পড়ছে কেউ। কাউকে রমামাসীর বাড়ীতে আসতে দু'জনের কাঁধে ভর দিয়ে আসতে হয়েছে। মুটিয়ে গেছে কেউ কেউ, দু'বেলা খাবার জোটেনা এমন বাড়ীর বউয়ের শারীরিক স্ফীতি চোখে পড়ার মতো।
একবার কয়েক গ্রাম পেরিয়ে এক মহিলা এলো রমামাসীর কাছে। যথারীতি সেই শাড়ীপ্যাঁচানো রিকশায় চড়িয়ে এনেছে তার পরিবারের কেউ, রিকশার পা রাখার জায়গায় গাদাগাদি করে বসে আছে দুতিনজন ছেলেমেয়ে, পিছনে ঝুলে আছে আরো দু'তিনজন। মহিলার চেহারা প্রচণ্ডরকম ভীতি উদ্রেককারী। অস্বাভাবিক শীর্ণ শরীর; চোখ দু'টো গভীর কোটরে ঢুকে আছে অথচ চোখের মণিজোড়া ঠেলে বেরিয়ে আসতে চাইছে। পাটের আঁশের মতো বিবর্ণ উস্কোখুস্কো চুল, কঙ্কালের মতো একটা হাত দিয়ে সেই চুল কপালের ওপর থেকে সরাতেই পুরো এক মুঠি চুল গোছা ধরে তার হাতে উঠে এলো! মহিলার হাতের বাজুতে কী একটা পট্টি বাঁধা, রমামাসী তার সঙ্গে সেটা নিয়ে কথা বলতে শুরু করলো, আমাদেরকে ঘর থেকে বের করে দিয়ে।
ওই করুণ অথচ ভীতিকর চেহারার মানুষটি আমার স্মৃতিতে একটা বিশেষ স্থান করে নিয়েছিলো। ঠিক যেন মানুষ না, ভূতপেত্নীর গল্পের বইতে তালগাছ থেকে নেমে আসা পেত্নীর ইলাস্ট্রেশন।
||২||
'৯৬-৯৭ সালে, বিশ্ববিদ্যালয়ে তৃতীয় বর্ষে পড়ার সময় রিসার্চ মেথোডোলজি নামের একটা পেপারের জন্য কিছু ফিল্ড ওয়ার্ক করতে হয়েছিলো। আমার কাজ ছিলো বস্তিতে। চট্টগ্রাম শহরের ঝাউতলা-নালাপাড়া বস্তি; চেহারাচরিত্রে যেমন হবার কথা তেমনই। এখানে একটা বিষয় খেয়াল করি, তা হলো এনজিও থেকে মাঠকর্মী পর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীরা নিয়মিত যাতায়াত করে বস্তিতে। পরিবার পরিকল্পনা বা গর্ভনিরোধের ব্যাপারটা বেশ পরিচিত সবার কাছে; আট-নয় বছরের ছোট মেয়েটিও সে ব্যাপারে যথেষ্ট জ্ঞান রাখে! তারপরও পরিবারগুলোর আকার বিশাল, পিলপিল করে ছেলেমেয়ে বের হয় একেকটা ছাপড়া থেকে।
বস্তির মহিলাদের কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে একটা ব্যাপারে নিশ্চিত হই। গর্ভনিরোধের পুরো দায়টা এখানে মেয়েদের; পুরুষরা কেউ এর দায়িত্ব নেয় না। অধিকাংশ মহিলা "বড়ি"র পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় ভুগতে ভুগতে এক পর্যায়ে এটা ত্যাগ করে। তাদের ভাষ্যমতে, বড়িতে "পেশার" হয়, প্রেশারের ওষুধ না কিনলে চলে না। নিয়মিত খেতে ভুলেও যায় অনেকে। তাই কেউ কেউ একটা জিনিস হাতের বাজুতে "অপ্রেশন" করে লাগায়। তবে সেটা লাগিয়ে অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়েছে। তখন আমার ছোটবেলায় গ্রামে রমামাসীর বাড়ীতে আসা মহিলাদের কথা মনে পড়ে। অদ্ভুত স্ফীত শরীর, অথবা সেই বীভৎস কঙ্কাল, হাতে মুঠোভর্তি চুল উপড়ে আসছে। এদের অনেকের হাতে নরপ্ল্যান্ট লাগানো হয়েছিলো। উল্লেখ করার মতো ব্যাপার হলো, নরপ্ল্যান্ট প্রতিস্থাপনের বিনিময়ে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে আসা-যাওয়ার ভাড়া, চাল, এমনকি মোরগ পর্যন্ত পেয়েছে তারা।
এই নরপ্ল্যান্ট আসলে কী? উইকি পড়ে অল্পস্বল্প যা জানা গেলো, মহিলাদের জন্য জন্মনিয়ন্ত্রণের এই পদ্ধতিতে ছয়টা সিলিকোনের ক্যাপসুলে ভরা হরমোনজাতীয় কোন বস্তু থাকে। বাহুর চামড়ার নীচে ইমপ্ল্যান্ট করে দিতে হয়; পাঁচ বছরের জন্য। এর পার্শ্ব প্রতিক্রিয়ার সংখ্যা ও তীব্রতা অনেক বেশী। উইকির তথ্যমতে, পপুলেশন কাউন্সিল (খেয়াল করুন, এর হেডকোয়ার্টার আমেরিকাতে) এটা বানিয়েছে। প্রথম এটার অনুমোদন দিয়েছে উত্তর-ইউরোপীয় রাষ্ট্র ফিনল্যান্ড (এই তথ্যটাও ইন্টারেস্টিং; এদের পপুলেশন গ্রোথ এমনিতেই নেগেটিভের দিকে), ১৯৮৩ সালে। খোদ আমেরিকা অনুমোদন দিয়েছে আরও অনেক পরে, ১৯৯০ সালে! মার্কেটিং শুরু করে আরও এক বছর পর। আবার এগারো বছরের মাথায় ২০০২ সালে বিতরণ বন্ধ করে দেয় (উৎপাদনের কী খবর?)। আর ইংল্যান্ড ১৯৯৯ সালে বাজার থেকে নরপ্ল্যান্ট তুলে নেয়।
তার মানে কী দাঁড়ালো? উন্নত দেশগুলো ফলাফল নিশ্চিত না হয়ে নিজেদের দেশে এইসব জিনিসের অনুমোদন দেয় না, আবার রেজাল্ট খারাপ আসলে তুলে নিতেও দেরী করে না। আর এই বস্তু কেমন কাজ করে, সেটা দেখার জন্য আগে আমাদের মতো গরীব দেশের মহিলাদের পঞ্চবার্ষিক গিনিপিগ বানানো হয়। এরা ধুঁকতে থাকে, ভুগতে থাকে, মরলে তো আরও ভালো।
||৩||
সামহোয়ারইন ব্লগের কর্ণধার আরিল্ড ক্লকারহগের কাছ থেকে কিছুদিন আগে একটা মেইল পেলাম। সহব্লগার হিসেবে তিনি মিথস্ক্রিয়াশীল নন একেবারেই; তার পাঠাভ্যাস সংক্রান্ত কোন ধারণাও আমার নেই, কেমন করে যে অর্ধলক্ষ কিংবা ততোধিক নিকের একজনকে মনে রেখেছেন সেটাই বিস্ময়কর। যাই হোক, আরিল্ড তার মেইলে একটি ফেইসবুক বার্তা শেয়ার করেছেন; যার পরিপ্রেক্ষিতে বাকী কথাগুলো চলে আসছে।
বার্তাটি এসেছে জনাব এম ই হকের কাছ থেকে, যিনি এমআইটি মিডিয়া ল্যাবের একজন গ্র্যাজুয়েট স্টুডেন্ট। ঢাকাবাসী দু'জন স্বেচ্ছাসেবকের সন্ধান করছেন তিনি, যাদের মাল্টিমিডিয়া ও কম্পিউটার বিজ্ঞানের সংশ্লিষ্ট কাজের দক্ষতা থাকতে হবে, নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে ব্যয় করার মতো কিছুটা সময় হাতে থাকতে হবে। যে প্রোজেক্টে তারা কাজ করবেন তার সম্পর্কে বলা হয়েছে "...project that involves piloting technology developed at the MIT Media Lab." আরও বলা হয়েছে, তাদের উদ্দেশ্য যথাযথ প্রযুক্তি ডিজাইনিঙের মাধ্যমে সেইসব মানুষজনের জীবনমানের উন্নতি ঘটানো, যাদের অটিজম শনাক্ত করা হয়েছে।
আমি প্রযুক্তিবিদ নই, ঢাকাবাসীও নই, তবে আমার সন্তানের অটিজম আছে, কাজেই এই প্রযুক্তি সম্পর্কে জানার আগ্রহে বার্তাটি খুঁটিয়ে পড়লাম। IEEE gold humanitarian fellowship, MIT public services center, MIT Media Lab, One Laptop per Child (OLPC)- অর্থায়নকারী হিসেবে এদের নাম জানা গেলো। প্রতি শিশুর জন্য একটা ল্যাপটপ- এটা ১০০ডলারের ল্যাপটপ নামেও পরিচিত। প্রথমবারের মতো এমন ৬টি ল্যাপটপ ঢাকার অটিজম ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশনে দান হিসেবে এসেছে যাতে কিছু গেইম সংযোজনের কাজ করা হবে। জানা গেলো, এই গেইমগুলোই হলো সেই বিশেষ প্রযুক্তি, যা কিনা বার্তার বক্তব্য অনুযায়ী অটিজম আছে এমন মানুষদের জীবনের মানোন্নয়ন ঘটাবে। তা কীভাবে ঘটবে সেই আকাঙ্ক্ষিত ঘটনা? প্রজেক্টের বিবরণে তার বিশ্লেষণ এরকম:
People diagnosed with autism often have difficulty producing intelligible speech. Currently, they go through one-on-one speech therapy with a speech therapist which is not only very disengaging, but also does not generalize to real life situations.
In this project, we have designed a set of computer games which uses different properties of speech, e.g., volume, speech rate, pitch as controllers for the game in real-time. For example, someone with a low volume in speech would have to raise their voice in order to control an object, car in context of car racing.
These games have been piloted in United States and have proven to be effective and engaging.
এখানে থমকে যেতে হয়। অটিজম আছে এমন অনেকের জন্যই গুছিয়ে অর্থবোধক বাক্য তৈরি করে কথা বলার মতো আপাতসামান্য ব্যাপারটি দুরূহ একটি কাজ; কাজেই প্রথম বাক্যটিতে দ্বিমত করার কিছু নেই। এই সমস্যা সমাধানের জন্য বিকল্প কিছু করা হয়েছে বা হবে, তার কী বিশেষত্ব থাকবে- সবই বোঝা গেলো। কিন্তু এর প্রয়োজনীয়তা বোঝাতে গিয়ে প্রচলিত স্পিচ থেরাপির ছিদ্রান্বেষণ এবং সেই ঘাটতি কম্পিউটার গেমসের মাধ্যমে পূরণের চেষ্টা কতোটুকু যুক্তিযুক্ত?
সুস্থ-স্বাভাবিক শিশুদের জন্যই বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ হলো দৈনিক সর্বোচ্চ দুই ঘন্টার স্ক্রিন-টাইম। অর্থাৎ টিভি-কম্পিউটার-ভিডিও গেমস সবকিছু মিলিয়ে ২ ঘন্টার বেশী স্ক্রিনের সামনে থাকা যাবে না। তাও প্রতি ৪৫ মিনিট পর চোখ ও মস্তিষ্কের বিশ্রামের জন্য অন্তত ১৫ মিনিটের বিরতি চাই। শিশুদের জন্য দীর্ঘসময় স্ক্রিনের সামনে কাটানো শুধু শারীরিক দিক থেকে ক্ষতিকর তাই নয়, শিশুর মানসিক বিকাশও বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাধাগ্রস্ত হয়। খুব সহজ উদাহরণ হিসেবে চেনাজানা কোন পরিবারের কথা ভাবুন, যেখানে অভিভাবকরা সময়ের অভাব অথবা অসচেতনতার কারণে শিশুকে ঘন্টার পর ঘন্টা টিভি বা কম্পিউটারের সামনে বসিয়ে রাখছে। বাচ্চা কথা শিখছে না, অন্যদের সঙ্গে কথা বলতে চাইছে না, অমিশুক ঘরকুণো হয়ে যাচ্ছে- এ অভিযোগগুলো আসছে। সেখানে অটিস্টিক শিশু, যারা ইতোমধ্যেই বিকাশগত প্রতিবন্ধকতার শিকার, তাদের অবস্থাটা কী দাঁড়াতে পারে।
||৪||
অটিজম থাকলে শিশু বিকাশগতভাবে মৌখিক ও অমৌখিক যোগাযোগ স্থাপন, সামাজিক মিথষ্ক্রিয়া, আলাপচারিতাসহ স্বাভাবিক সামাজিক আচরণ প্রকাশে সমস্যা বোধ করে। কারো দিকে দৃষ্টি-সংযোগ বা আই-কন্ট্যাক্ট ঠিক রেখে তাকিয়ে কথা বলা তার জন্য খুবই কঠিন একটা কাজ। এর পিছনে যে শুধু মানসিক কারণ জড়িত তা কিন্তু না। আমাদের পাঁচটি ইন্দ্রিয় চোখ, কান, নাক, জিভ ও ত্বকের মাধ্যমে আমরা দৃশ্য, শব্দ, গন্ধ , স্বাদ ও স্পর্শের অনুভূতি পাই। একইসঙ্গে এক বা একাধিক ইন্দ্রিয়ের দ্বারা একাধিক অনুভূতি অর্জন আপনার জন্য অতি সাধারণ বিষয়। কিন্তু অটিজম থাকলে sensory perceptions সুবিন্যস্ত থাকে না, যার জন্য একই সঙ্গে একাধিক ইন্দ্রিয় কাজে লাগিয়ে যে অনুভূতি গ্রহণ করতে হয় তা তার স্নায়ুতে বাড়তি চাপ ফেলে। তাই দেখা যায় অটিস্টিক শিশু অন্য কারো দিকে তাকিয়ে কথা বলতে গেলে ভয়ার্ত হয়ে যায়, খেই হারিয়ে ফেলে, অথবা চোখ সরিয়ে মুখ লুকিয়ে অন্যদিকে ফিরে কথা বলার চেষ্টা করে।
এই সীমাবদ্ধতাগুলোর প্রতি দৃষ্টি দিয়ে এবং আচরণের বিশেষ বৈশিষ্ট্য যেমন রুটিনমাফিক কাজের প্রতি পছন্দনীয়তাকে কাজে লাগিয়ে শিশুর জন্য বিশেষ কিছু structured play ডিজাইন করে স্পিচ থেরাপিতে তার ব্যবহার করা হয়। এখানে থেরাপিস্ট শিশুর সঙ্গে খেলার ছলে তাকে দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন ধরণের ধারণা, কাজ ও কথার সঙ্গে পরিচিত করে তোলেন। রং, আকৃতি, গণনার সংখ্যা, সিকোয়েন্স বা ঘটনাক্রম, প্যাটার্ন, সমজাতীয় জীব বা বস্তুর গ্রুপ, অপেক্ষা, সাহায্য চাওয়া, পালাক্রম, কোন কাজের সূচনা ও সমাপ্তি ইত্যাদি বহু বিষয়ের কার্যকর ধারণা শিশু স্পিচ থেরাপি থেকে পেতে পারে। স্পিচ থেরাপিতে শিশুকে শুধু বসে থাকতে হয় তা না; ফিজিক্যাল মুভমেন্টের সুযোগও আছে, যেটা কম্পিউটার গেমসে নেই। তারপরও উপরে উল্লিখিত ওই বার্তা অনুযায়ী স্পিচ থেরাপি "not only very disengaging, but also does not generalize to real life situations".
এই বক্তব্যের প্রত্যয়ণকারী কে বা কারা?
অটিস্টিক শিশুর জন্য খুব সাধারণ আচরণ হলো হঠাৎ করে অন্যমনস্ক হয়ে পারিপার্শ্ব থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নেয়া, অদ্ভুত এক ঘোরের জগতে চলে যাওয়া, এবং সে সময় অনাকাঙ্ক্ষিত কিছু কাজ পুনরাবৃত্তভাবে করতে থাকা (হাত কামড়ানো, চুল ছেঁড়া, নখ দিয়ে হাত বা পায়ের বিশেষ অংশে বারবার আঁচড় দিয়ে রক্তপাত পর্যন্ত ঘটানো; এগুলো অটিস্টিক শিশু করে থাকে কারণ তার স্পর্শের ইন্দ্রিয়ানুভূতি understimulated)। স্পিচ থেরাপি চলাকালে সার্বক্ষণিকভাবে পর্যবেক্ষণে থাকার কারণে শিশু অন্যমনস্ক হয়ে গেলে বা খেলায়/কাজে কোন সমস্যায় পড়লে সেটার প্রতিকারের ব্যবস্থা আছে। স্পিচ থেরাপিকে "disengaging" বলে অভিযুক্ত করে কম্পিউটারের সামনে শিশুকে বসিয়ে রাখার প্রেসক্রিপশন দিচ্ছেন যারা, তারা এর কী সমাধান দেবেন?
স্পিচ থেরাপি শুধু থেরাপিস্টের অধীনেই চলতে পারে তা নয়, শিশুর অভিভাবক এই কৌশলগুলো শিখে চর্চা করতে পারেন, নিজস্ব কল্পনাশক্তি কাজে লাগিয়ে শিশুর প্রয়োজন ও পছন্দ অনুযায়ী নতুন খেলা তৈরী করতে পারেন। খুব সঙ্গত কারণেই এখন পর্যন্ত উন্নত বিশ্বে অটিজমজনিত ঘাটতি কমিয়ে আনতে স্পিচ থেরাপির উপর ব্যাপক গুরুত্ব আরোপ করা হয়ে আসছে। অভিভাবকরা সুফল পান বলেই ব্যয়সাপেক্ষ হওয়া সত্ত্বেও অটিস্টিক সন্তানকে স্পিচ থেরাপিস্টের কাছে নিয়ে যান এবং সে অনুযায়ী নিজেরা শিশুর সঙ্গে কার্যকর সময় ব্যয় করেন। শিশুর সঙ্গে এই যে সক্রিয় সময় ব্যয়- এই কাজটির কোনও বিকল্প নেই। অটিস্টিক শিশু যেহেতু সামাজিক আচরণ প্রকাশে চরম সীমাবদ্ধতার শিকার, তাই তার জন্য সময় ব্যয়ের কাজটি সামাজিক মানুষকেই করতে হবে, গেইম চালানো কম্পিউটার অন্তত এই কাজের জন্য কখনোই মানুষের বিকল্প হতে পারে না।
উল্লিখিত রেসিং গেইমের বিশেষত্ব হিসেবে বলা হয়েছে, নিচুস্বরে কথা বলা শিশু কণ্ঠ উচ্চগ্রামে না তুললে গেইমের নিয়ন্ত্রণ আনতে পারবে না তাই সে তখন গলা তুলে কথা বলবে। তাহলে ভলিউম, স্পিচ রেইট, পিচ- এগুলোই শুধু স্পিচের বৈশিষ্ট্য? ইফেক্টিভ কনভার্সেশন বলতে যা বোঝায়, বক্তা-শ্রোতার দৃষ্টিসংযোগ, বডি-ল্যাংগুয়েজ বা অঙ্গভঙ্গিসহ অমৌখিক ও মৌখিক যোগাযোগের উপলব্ধির মাধ্যমে মিথষ্ক্রিয়া বা ইন্টারঅ্যাকশন--- সেটা চর্চার সুযোগ এই গেমসে কোথায়? কীভাবে বলা হলো এটা "effective and engaging" হিসেবে প্রমাণিত!
||৫||
আমাদের দেশে অটিস্টিক শিশুর কোন পরিসংখ্যান নেই (বিশ্বের মাত্র ৪টি দেশের আছে)। পনেরষোল কোটি জনসংখ্যার দেশে এখনও একজনও স্পিচ থেরাপিস্ট নেই। তাতে কী, শ'ডলারি ল্যাপটপ চলে এসেছে। ইউএসএ মেইড গেইম চলে এসেছে। জনসেবার আহ্বানে উদ্বুদ্ধ প্রযুক্তিবিদও হয়তো জোগাড় হয়ে গেছে। আমরা অসচেতন (শখে নয়; এক্সপোজারের অভাবে অসচেতন) হুজুগে অভিভাবকরা "এই তো পেয়েছি" বলে বসিয়ে দেবো সন্তানকে এই কার রেসিং গেইমের সামনে। নিশ্চিন্তে অন্যসব দরকারী কাজে সময় দেবো। সে মাউস হাতে স্ক্রিনের দিকে একদৃষ্টিতে চেয়ে থাকলেই হলো। সব ঠিক হয়ে যাবে।
এই অবস্থাটি বাস্তবে এখনও ঘটেনি; তবে ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করছি। আমার এই আশঙ্কা অতিকল্পনা মনে হলেও একেবারে অমূলক বা অহেতুক কিন্তু নয়। আমরা দেখেছি উন্নত দেশের উদ্ভাবিত প্রযুক্তির কার্যকারিতা যাচাইয়ের জন্য আমাদের দেশের দরিদ্র মহিলারা (এমনকি তাদের গর্ভস্থ শিশুও) কীভাবে গিনিপিগ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। একদশক আগে আমেরিকা ইংল্যান্ডের বাজার থেকে তুলে নেয়া নরপ্ল্যান্ট এখনও বহাল তবিয়তে বাংলাদেশে চলছে; বিষবটিকা নরপ্ল্যান্টের ছোবল এখনও বইছে গিনিপিগদের বাহু।
সুস্থ স্বাভাবিক পূর্ণবয়স্ক মানুষকে যদি টেস্ট কেইস হিসেবে ব্যবহার করা যায়, এই নির্বোধ শিশুগুলোকে কেন নয়? আমার আশঙ্কা মিথ্যে প্রমাণিত হলে বড় খুশি হতাম।
=====================================================
৪ ফেব্রুয়ারী সন্ধ্যা ৬:৫৬
এইমাত্র এম ই হকের একটা লেখা পড়লাম, ডেইলি স্টারে। নিজে যেহেতু ভোগান্তির অভিজ্ঞতা সামনাসামনি দেখেছেন, আমি আশা করবো জনাব এম ই হক স্পিচ থেরাপি বিষয়ে তার (অথবা প্রজেক্টের বিবরণদাতার) বক্তব্য নিয়ে আরেকটু ভাববেন এবং বিষয়টি বাংলাদেশের অভিভাবকদের (যারা এক্সপোজারের অভাবে অসচেতন) যে বিভ্রান্ত করতে পারে, সেটা বুঝতে পারবেন।
মন্তব্য
এরকম আশঙ্কা একেবারে উড়িয়ে দেয়া যায়না। ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের নামে নিজেদের দেশেও এরকম অনেক কিছু পরবর্তীতে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। সেদিক বিচারে অনুন্নত দেশে দায়বদ্ধতার বাইরে এসে "সফল" পরীক্ষা সম্পন্ন করা সম্ভব। এরা যে সেটা করবে তা অসম্ভব নয়।
আমি পাঁচ বছর আগের নিজেকে দিয়ে বুঝতে পারি, অটিজমের ব্যাপারে ভুক্তভোগী হবার আগ পর্যন্ত কারও ধারণাই থাকে না সমস্যাটা আসলে কী আর সমাধান কীভাবে আসবে। দিশাহারা দুশ্চিন্তার সময়ে মানুষ যে যা বলে সবই বিশ্বাস করে আঁকড়ে ধরতে চায়। আর যদি উন্নত দেশের বড় বড় নাম জড়িত থাকে তাহলে তো কথাই নেই। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব অটিস্টিক বাচ্চাদের স্পিচ থেরাপিসহ আর্লি ইন্টারভেনশন জরুরি। কোন অলৌকিক গেইম খেলার আশায় বসে থাকাটা কাজের কথা না, এটা বাংলাদেশের ভুক্তভোগী অভিভাবকদের বুঝতে হবে।
ট্রায়াল বা বাণিজ্যের বিনিয়োগ যেটাই হোক না কেন, তাতে ভয়ের কারণ আছে। কারণ আমাদের অভিভাবকরা এখনও সেরকম পর্যায়ে সচেতন হবার মতো এক্সপোজার পান না।
পড়ে বুকটা ভারি হয়ে আসল।
বাবা মা ছাড়া কেউ এই শিশুদের কষ্ট বুঝবে না। বোঝার কথাও না। আর তাদেরই গিনিপিগ বানাতে ওই কর্পোরেটদের একটুও মায়া হয় না।
ব্যবসা হয়ত উন্নতির সবচেয়ে ভাল পথ। তাই বলে এভাবে? অসহায় মানুষগুলোর ওপর এভাবে সুযোগ নিয়ে?
যেখানে প্রয়োজন আর আবেগ জড়িত সেখানেই বাণিজ্যের সুযোগ। সেই সুযোগটার অপব্যবহার করে অমানবিক কিছু করা হচ্ছে কিনা তা দেখার দায়িত্ব সরকারের, সংশ্লিষ্ট বিষয়ের বিশেষজ্ঞরাও নৈতিক দায় এড়াতে পারেন না। উন্নত দেশে শক্তিশালী অ্যাকটিভিজমও কাজ করে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের দেশে এরকম চর্চা কম।
অপু আপনার মন্তব্যের জন্য অনেক ধন্যবাদ। আপনার কোন ব্লগ থাকলে লিংক দেয়ার অনুরোধ রইলো।
আপ্পি, আমি তো পালিয়ে বেড়াই সবকিছু থেকে। কেন জানিনা বস্তুটি খুলেছিলাম। কিন্তু প্রতিনিয়ত পালিয়ে থাকতে থাকতে নিজের ঘরের খবরই নেয়া হয়না ঠিকমত।ওখান থেকেই আপনার ঠিকানা পাওয়া।
http://www.somewhereinblog.net/blog/bisher_peyala/
আপুমনি,
লেখাটা পড়ে বুকটা ভারী হয়ে এলো আমার... আমি কেন যেন ভাবতে পারিনা আমরা মানুষের জীবনকেও পণ্য হিসেবে দেখতে পারি! অথচ নিত্যই এই সত্যটিকে উপলব্ধি করছি... গিনিপিগ বানিয়ে রেখেছে এদেশের কত হাজার হাজার মায়েদের...
একটা দেশের সুস্থ সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য গর্ভবতী মায়েদের স্বাস্থ্য সচেতনতা আর তাদের প্রতি care নেয়া আমাদের জাতির জন্যই একটা আবশ্যক দ্বায়িত্ব... অথচ আমরা কেমন!
এবার যেমন অটিস্টিকদের জন্য স্পিচ থেরাপি!! আমি দিব্যি বুঝতে পারলাম এইটা দুর্বল মনের অভিভাবকদের হাতে তুলে দিয়ে শিশুদের পরিবর্তন আর অবস্থার উপর রিপোর্ট তৈরি করবে উন্নত দেশের নামধারী এসব এন জি ও গুলো...
আরেকটা কথা কী... এসব কথা আমাদের সচিবালয় পার হয়েই আসে। ওখানে মানুষের পরিবর্তে অর্থখোর খাটাশ বসে থাকলে জাতিকে গিনিপিগ বানিয়ে, ছিবড়ে বানানো হবে সৃষ্টির ধ্বংস হওয়া অবধি...
হঠাৎ মেজাজ খারাপ হয়ে গেলো দেখে অনেক কথা বললাম। ভালো থাকবেন আপু। শুধুই প্রার্থনা করি... নিজেকে বড্ড অসহায় লাগে সবসময়!!

-- মাহমুদ ফয়সাল
আমাদের ভয়ের কারণ আমরা নিজেরাই, কারণ আমাদের সচেতনতার অভাব।
এ ধরণের প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রক্রিয়াগুলো স্বচ্ছ হোক, ভুক্তভোগীদের উপকারে আসুক- এই আশায় থাকা ছাড়া আর কী করতে পারি আমরা!
I understand the emotion that drives your writing. Being a mother of an autistic kid, I am sure you have been through a lot. I am very amazed that you have spent so much time analyzing a short note that I have made public through facebook. The purpose of this note was to recruit some volunteers, and not to talk about methods and rationale of our approach. If you were curious to learn about our approach, you could have just emailed me for the research paper that we have published, reviewed and critiqued by top researchers in this field. The website that you have visited to read my articles also has the published research papers that you could have read to enhance your understanding of our approach.
It is very unfortunate that without trying to understand what we are trying to do, you have posted untrue and misleading information in your blog. Please understand that I am not trying to promote a product here to make money. This is solely an unpaid research effort to understand autism better.
If you have any further questions, I would be happy to field them.
M. Ehsan Hoque
Affective Computing Group
Media Laboratory, E14-374A
Massachusetts Institute of Technology
http://mehoque.com
জনাব এম এহসান হক, আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ। আপনার ফেইসবুক মেসেজটিই আমি যেভাবে পেয়েছি হুবহু উদ্ধৃত করেছি, এখানে "untrue and misleading information" দেয়ার সুযোগ কোথায় বুঝলাম না। অটিস্টিক শিশুদের জন্য স্পিচ থেরাপির প্রয়োজনীয়তা, কম্পিউটারগেইমস-নির্ভরতার ক্ষেত্রে অটিস্টিক শিশুর আচরণ সম্পর্কিত আশঙ্কা- এসব বিষয়ে পোস্টের বক্তব্যে আপনার কোন দ্বিমত থাকলে নির্দিষ্টভাবে জানাতে অনুরোধ করছি।
উদ্ধৃত বার্তাটির উদ্দেশ্য ভলান্টিয়ার রিক্রুট করা, সেটা বোধগম্য। কিন্তু প্রোজেক্টের বিবরণ দিতে গিয়ে স্পিচ থেরাপি সম্পর্কে বলা হয়েছে এটা "not only very disengaging, but also does not generalize to real life situations." এই কথাটি না থাকলে উল্লিখিত প্রোজেক্টের উদ্দেশ্য নিয়ে আমার কোন প্রশ্ন অথবা আশঙ্কা থাকার কারণ ছিলো না।
বার্তাটি পড়ে একজন ভুক্তভোগী অভিভাবক হিসেবে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে কিছু বিষয়কে প্রশ্নসাপেক্ষ মনে হয়েছে, সেকারণে আমার নিজস্ব আশঙ্কার কথা জানিয়েছি। আপনার মন্তব্য পেয়ে জানা গেলো প্রকল্পটি বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত নয়। কিন্তু ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের সম্ভাবনা কতোটুকু তা নিশ্চিত হওয়া গেলো না।
আমাদের দেশে এধরণের বিষয়ে গণসচেতনতা ও জ্ঞানের অভাব প্রকট। উন্নত দেশ ও নামকরা প্রতিষ্ঠানের নামযুক্ত যে কোন কথা আমরা আক্ষরিক অর্থে গ্রহণ করে নিই। আপনার বা আপনাদের গবেষণাপত্র পড়ে বোঝার মতো জ্ঞান আমাদের অনেকের নেই, সেটা আপনার জানার কথা। একইসঙ্গে এটাও বোঝার কথা, ফেইসবুকের মতো একটি সামাজিক নেটওয়ার্কে স্পিচ থেরাপি সম্পর্কে এমন একটি মন্তব্য বহু অভিভাবককে বিভ্রান্ত করতে পারে। এ বিষয়ে আপনার সদয় মনোযোগ আকর্ষণ করছি এবং বার্তাটি সম্পাদনার অনুরোধ জানাচ্ছি। আপনাদের প্রোজেক্ট ফলপ্রসূ হোক, বহু ভুক্তভোগী মানুষের জীবনে আশার আলোর সন্ধান দিক, কিন্তু একইসঙ্গে কাউকে বিভ্রান্ত না করুক, সেই আশা রইলো। ভালো থাকবেন।
আপু, আপনার এই লেখা প্রিন্ট আউট করে পরিচিতদেরকে দিব ভাবছি। সবার এই বিষয়গুলো ভাবা দরকার।
পড়ার জন্য অশেষ ধন্যবাদ। পরিচিত কারো প্রয়োজন আছে মনে করলে এই সাইটের অটিজম বিষয়ক যে কোন লেখা শেয়ার করার অনুরোধ রইলো।
নতুন মন্তব্য করুন