শিশুর গ্রস ও ফাইন মোটর ক্রিয়াক্রমের উন্নতির জন্য কী করবেন

শিশুর গ্রস ও ফাইন মোটর ক্রিয়াক্রমের উন্নতির জন্য কী করবেন

সন্তানের অটিজম আছে এমন অভিভাবকদের জন্য

মোটরস্নায়ু কোন কাজ করার সময় শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের নিয়ন্ত্রণ ও সমন্বয় করে। এ স্নায়ুর জন্যই দেহের ভারসাম্য রেখে একপায়ে ভর দিয়ে দাঁড়াতে পারা, নির্দিষ্ট লক্ষ্যে কোন কিছু ছুঁড়তে পারা, ডিগবাজি দিতে পারা ইত্যাদি গ্রস-মোটর ক্রিয়া সম্ভব হয়। অটিস্টিক শিশুর মোটরস্নায়ুতে সমস্যা থাকে।

যদি আপনার শিশুর অটিজম শনাক্ত হয়ে থাকে তাহলে খেয়াল করে দেখুন, সে কি কিছুটা সময় এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে? ডান-বাম উভয় পায়ে পালা করে দেখুন। কুতকুত-কিতকিত বা হপস্টেপ খেলার ভঙ্গিতে এক পায়ে লাফিয়ে এগোতে পারে? এধরণের গ্রস মোটর অ্যাকটিভিটিতে তার সমস্যা থাকতে পারে। প্রতিদিন কিছুটা সময় এগুলো চর্চা করলে তার শরীরের জড়তা কাটবে। হয়তো এ ধরণের কোন সীমাবদ্ধতার জন্য সে বন্ধুদের সঙ্গে খেলতে পারে না।

গ্রস মোটর সমস্যা কমিয়ে আনতে আপনার সন্তানকে বিভিন্ন ধরণের তলে (পরিষ্কার ও নিরাপদ মেঝে, কার্পেট, ঘাস) শুয়ে পড়ে গড়াতে (রোল করা) শেখান। বিভিন্ন পুরুত্বের লেপ, কম্বল, কাঁথা ইত্যাদিতে মুড়ে গড়াগড়ি করতে দিন। বড় কার্ডবোর্ডের বাক্সের ঢাকনা ও তলা কেটে তার ভিতরে ঢুকে গড়াগড়ি করতে দিন। অবশ্যই গড়াগড়ির সময় তাকে কাছ থেকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখুন এবং তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করুন। হামাগুড়ি দিতে বলুন। ওপরে-নীচে, ডানে-বামে, সামনে-পেছনে এরকম বিভিন্ন ভাবে লাফঝাঁপ দেয়া অভ্যাস করান। লাফাতে লাফাতে এগিয়ে যাওয়া বা hopping শেখান। প্রথমে দুই পায়ে, তারপর ক্রমশঃ এক পায়ে, এক হাত দিয়ে এক পা ধরে রেখে, দুই হাত মাথার উপরে জড়ো করে রেখে- এভাবে অগ্রসর হোন। সামনে, পিছনে, পাশে ও চক্রাকারে দৌড়াতে অভ্যাস করান। লাফঝাঁপে জড়তা কেটে গেলে স্কিপিং রোপ দিয়ে তাকে লাফাতে শেখান। খেয়াল রাখবেন যেন দড়িতে পা জড়িয়ে পড়ে গিয়ে আঘাত না পায়, সেজন্য দৃঢ়ভাবে মেঝের সঙ্গে লাগানো আছে এমন কার্পেটের বা ঘাসের উপরে অভ্যাস করান। দু'পাশে ছোট দু'টি সাপোর্ট হুইল আছে এমন সাইকেল চালাতে দিন। প্রথম দিকে সে হয়তো প্যাডেলে চাপ দেবে না; সাইকেলে বসে থাকবে। তখন ধৈর্য ধরুন। আপনার হাত দিয়ে তার পায়ের পাতা প্যাডেলের সঙ্গে চেপে ধরে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে তাকে বোঝান যে এভাবে সাইকেল সামনে এগোবে। প্রয়োজনে আপনি তার পাশে পাশে হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে যান।

আপনার শিশুর ফাইন মোটর অ্যাকটিভিটি আপনার নিবিড় মনোযোগ দাবী করে। শিশুর পেন্সিল ধরার ভঙ্গিটি খেয়াল করুন। সে কি পেন্সিল বা কলম মুঠোবন্দী করে ধরে? তিন আঙ্গুলে পেন্সিল ধরার স্বাভাবিক ভঙ্গিতে তাকে পেন্সিল ধরতে শেখান। এজন্য সাধারণ গোল সিলিন্ডারাকৃতি পেন্সিলের বদলে তিনকোণা প্রিজমআকৃতির পেন্সিল ব্যবহার করুন। আপনার হাতের যে তিন আঙুল পেন্সিল ধরতে ব্যবহার করেন, তার অগ্রভাগে নখের উল্টোদিকটাতে রং (ফ্যাব্রিক পেইন্ট হলে ভালো হয়) লাগান। স্বাভাবিক ভঙ্গিতে পেন্সিল ধরুন। দেখবেন আপনার আঙুল থেকে পেন্সিলের গায়ে তিন জায়গায় রং লেগেছে। রংচিহ্নিত ওই তিন জায়গা বরাবর শিশু তার তিন আঙুল দিয়ে পেন্সিলটি ধরবে। প্রথম প্রথম সে অল্প সময়ের জন্য ঠিকভাবে পেন্সিল ধরে একটু পরেই আবার মুঠো করে ফেলবে। তখন আবার তাকে মনে করিয়ে দিয়ে ঠিকভাবে ধরাতে হবে। প্রতিদিন সকালে একবার, সন্ধ্যায় একবার করে এই অভ্যাস চালিয়ে যেতে হবে। প্রথমেই শিশুকে বর্ণমালার অক্ষর লেখা শেখাবেন না। একেবারেই এলোমেলো লাইন টানা, গোল গোল দাগ, ইচ্ছেমতো আঁকিবুকি করে পেন্সিল ধরার সঠিক কায়দা কিছুটা রপ্ত করে ফেললে তারপর বর্ণমালা বা ফুলপাখির ছবি ইত্যাদিতে অগ্রসর হতে পারেন।

ফাইন মোটর সমস্যার কারণে ছোটবড়ো অনেক দৈনন্দিন কাজে অংশ নিতে আপনার সন্তান অসুবিধা বোধ করবে। দু'আঙ্গুল দিয়ে চিমটি দেয়ার মতো করে পিন বা কাঠিজাতীয় কোন জিনিস ধরা, হাত ধোয়া, হাত ধুয়ে মোছার আগে হাত থেকে পানি ঝেড়ে ফেলা, অথবা কুলি করার কায়দাটা সে পরিবারের অন্যদের দেখেই শিখে ফেলতে পারবেনা। শেখালেও দেখা যাবে হাত ধুয়ে ঢেউয়ের মতো দোলাচ্ছে, পানি ঝরে পড়বে এমনভাবে ঝাড়তে পারছে না। হাত মুছতে গেলেও তোয়ালেটা এমনভাবে ধরছে যে ঠিকমতো মোছা হচ্ছেনা। কাঁচি দিয়ে কাগজ কাটা, চামচ বা কাঁটাচামচ ধরে খাওয়া, জামার বোতাম লাগানো এধরণের কাজে তার সমস্যা থাকার কথা। তার পাশে থেকে এগুলো নিয়মিত অভ্যাস করাতে হবে। মনে রাখবেন, কোন কাজে স্বনির্ভরতার বিষয়টি বুঝতে পারা তার জন্য বেশী জরুরী, তাই প্রথমদিকে বোতাম, হুক বা জিপার নেই এমন জামাকাপড় দিন যাতে সে নিজে নিজে এগুলো পরতে অভ্যস্ত হয়ে উঠতে পারে। আপনার সন্তান পোলোনেক বা গোল গলার টিশার্ট বা টপ, ইল্যাস্টিক দেওয়া প্যান্ট, স্কার্ট, পুলওভার ধরণের শীতবস্ত্র, ভেলক্রো স্ট্রিপ লাগানো জুতো (ফিতা বা বাকলস নেই) ও জ্যাকেট ইত্যাদি পরতে শিখে যাবে সহজেই। তখন বাড়তি কোন অ্যাকসেসরি যেমন বোতাম আছে এমন কিছুতে হাত লাগাতে দিন। প্রথমদিকে বড় আকারের বোতাম ও পুরু জিপার লাগানো ও খোলা অভ্যাস করান। তখন আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে দিন যেন সে দেখতে পায় কী করছে।

এই কাজগুলো করার আগে হাত ও আঙুলের জড়তা কমাতে আটা বা ময়দার তাল দু'হাতে রোল করতে দিন, ইচ্ছেমতো আকৃতি দিয়ে কিছু বানাতে বলুন। প্রতিদিন নতুন করে আটার দলা তৈরি না করে একবারে প্লে-ডো (play-dough) বানিয়ে রাখলে বার বার ব্যবহার করা যেতে পারে।

[বাড়ীতে প্লে-ডো তৈরী করতে একটা সসপ্যানে ২ কাপ ময়দা, ৪ টেবিল চামচ ক্রিম অফ টারটার (সাদা পাউডারের মতো দেখতে), ২ টেবিল চামচ রান্নার তেল, ১ কাপ লবণ ও ২ কাপ পানি মিশিয়ে অল্প আঁচে চুলায় বসিয়ে ৩ থেকে ৫ মিনিট নাড়ুন। আঠালো ভাব কমে রুটি বেলার আটার মতো হয় এলে নামিয়ে নিন। ঠাণ্ডা হলে কয়েক ভাগে ভাগ করে পছন্দমতো ফুড কালার মিশিয়ে বিভিন্ন রঙের প্লে-ডো তৈরী করে নিতে পারেন। পলিথিনে মুড়ে এয়ারটাইট জার বা কন্টেইনারে সংরক্ষণ করুন। মাটি দিয়ে বিভিন্ন আকৃতির জিনিস তৈরি শিশুদের খুব মজার খেলা। প্লে-ডো মাটির সুবিধাজনক বিকল্প। এটার সুবিধা হলো রঙের কারণে বাড়তি আকর্ষণ যোগ করে এবং একবার বানিয়ে রাখলে বহুবার ব্যবহার করা সম্ভব। তাছাড়া ক্ষতিকর উপকরণ না থাকায় শিশু মুখে দিয়ে ফেললেও ভয়ের কিছু নেই (বাড়তি লবণাক্ততা ছাড়া)।

কাগজ-কলম দিয়ে লেখা শুরুর আগে প্লে ডোর ওপর পেন্সিল দিয়ে শিশুকে লিখতে শেখান (কালি বা শীষ নয়, বরং পেন্সিলের অগ্রভাগের চাপে দাগ পড়বে)। তার সঙ্গে বালি, আটা বা ময়দার উপরে অথবা তার নিজের ও আপনার শরীরে পালাক্রমে আঙুল বুলিয়ে অক্ষর বা সংখ্যা লেখার খেলা খেলুন। ডাস্টফ্রি অর্থাৎ গুঁড়ো ঝরে না এমন চক দিয়ে স্লেটে লিখতে দিন। বেশ কয়েক পাক চাবি ঘুরিয়ে দিলে চলে এমন খেলনার চাবি ঘোরাতে দিন তাকে। হাত বা আঙুলের জড়তা কমাতে পাপেট নিয়ে খেলাও সাহায্য করতে পারে (পাপেট হলো এমন নরম পুতুল যার ভেতরটা ফাঁপা এবং উল্টোদিকের ফুটো দিয়ে পুতুলের মুখ বরাবর হাত ঢুকিয়ে আঙুলের কায়দায় কথা বলার মতো করে মুখ নাড়ানো যায়)।

মন্তব্য

নুশেরা

ক্যামন আছেন? অপনা?

অনেকদিন থেকেই আপনার সা.মু. তে অনুপস্থিতি দেখে ভাবছিলাম এখানটায় ঢুঁ দেবো, অনেকটা ব্যস্ততা আর খানিকটা আলসেমিতে হয়ে ওঠেনি।

জীবনে তো ভালো কাজ কিছু করিনি, তাই শেষ (রিটায়ারমেন্টের) সময় যতো এগিয়ে আসছে, ভাবছি সেনা সহায়ক স্কুলের মতো করে প্রতিবন্ধী বাচ্চাদের একটা প্রাইভেট স্কুল দিবো। আর্থিক অবস্থা হতাশাজনক বলেই এখনো প্ল্যানিং লেভেলে আছি। কয়েকজন সমমনা কলিগকেও পেয়েছি। আপনার লেখা থেকেও জ্ঞান অর্জন করছি। দেখা যাক কতোটা কী করা যায়? দোয়া করবেন যেনো আমাদের এই প্রচেষ্টা সফল হয়।

ভালো থাকবেন। আপনার কন্যার জন্য অনেক আদর।

খুবই খুশী হলাম আপনার মন্তব্য পেয়ে। কতোদিন পর!

সামুতে আজকাল অনেক কম যাওয়া হয়।

আপনি যদি বলেন জীবনে ভালো কিছু করেননি তাহলে আমি কই যাই বলেন! অঢেল অর্থ না থাকলে স্কুলের জন্য ভৌত অবকাঠামো আর ভালো কর্মী পাওয়া আমাদের দেশে প্রায় অসম্ভব। মূলধারার কোন স্কুলের সঙ্গে দ্বিতীয় শিফটের চুক্তি করা একটা বিকল্প হতে পারে। যাই করুন না কেন, ভাবনার মহত্বের জন্যই অভিবাদন।

এই লেখাগুলো সহ আরও কিছু মিলিয়ে একটা বইয়ের কাজ করলাম। মোটামুটি বড়সড়, প্র্যাকটিকাল অংশ বেশী। কপালে থাকলে এই বইমেলাতে আসতে পারে। আমার তো যাওয়া সম্ভব হবে না, আপনারা হাতে পেলেই আনন্দ।

ভালো থাকবেন। আপনাদের সবার জন্য শুভকামনা।

thank you so much. akta question: cream of tartar kothae paua jae? price koto?

বেকিং পাউডার, কাস্টার্ড পাউডার, এসেন্স- রান্নার এরকম উপকরণ পাওয়া যায় এমন দোকানেই থাকার কথা। ছোট প্লাস্টিকের কৌটায় ১০০-১২৫গ্রাম সাদা খরখরে পাউডারের মতো, দাম পঞ্চাশ থেকে একশ টাকার মধ্যে থাকার সম্ভাবনা। বড় ডিপার্টমেন্ট স্টোরে নির্ধারিত শেলফে অবশ্যই পাবেন।

Apnar Lakah Sundor, Sabolol....

porche kinto mona hoy apni bolnchan..

Donnobad.

পড়ার, এবং জানান দেয়ার জন্য অশেষ ধন্যবাদ। আপনার ব্লগ থাকলে লিঙ্ক দিলে খুশি হবো।

মন্তব্যে ইংরেজি হরফ দেখে বলছি, বাংলায় টাইপ করা খুব কঠিন না কিন্তু। ভালো থাকবেন সব সময়।

নুশেরা আপু, মন খারাপ হয়ে গেলো। (এটা প্রকাশের দরকার নেই)

মুছলাম না। মন খারাপের মতো কী আছে এই পোস্টে, জানা দরকার। জানা দরকার আপনার নামধামও। কষ্ট করে পড়ে যাচ্ছেন, আরেকটু কষ্ট করে লিখেও যান, কোনভাবে চিনি কিনা।

একটু অন্য প্রসঙ্গ। একই পোস্টে আপনার আগে কেউ একজন আমার শিশুসন্তানের নাম নিয়ে নিজের বিকৃত পাশবিক প্রবৃত্তির জানান দিয়ে গেছেন। উদ্ভট, অপ্রকাশযোগ্য গালিগালাজ এখানে এই প্রথম না; বিচলিত হলে সাইট বন্ধ করে দিতাম অনেক আগেই। তবে আজ ভাবছি কী দুর্ভাগা সেই পিতামাতা, যারা এমন কদাকারমনা সন্তান জন্ম দিয়েছেন!

ভালো থাকবেন।

পোস্টের কোনোকিছু মন খারাপের জন্য দায়ী না। আপনি আমার মন্তব্যের জবাব দিচ্ছেন না, এইজন্য মন খারাপ। এ পর্যন্ত আপনার দরকার মেটালাম। আর পারছি না।

আপনার অন্য প্রসঙ্গটি পড়ে খারাপ লাগলো। কিন্তু সব্বাই যে পবিত্রমনা হবে এমনটি আশা করা বোধহয় ঠিক না। এই কথাটা আপনি অবশ্যই জানেন। তাও কেন লিখলাম? জানি না। মনে হয় কারো কোনো কষ্টের কথা শুনলেই তাকে কনডোলিং-এর গতানুগতিক বদঅভ্যাস থেকে বেরিয়ে এসেছে লাইনটি। নুশেরা'পুকে সান্তনা দেয়ার দুঃসাহস দেখানোর জন্য আমাকে মাইনাস।

অজ্ঞাতে থাকা কারো সঙ্গে কথা চালিয়ে যাবার একটা অস্বস্তি কোথায় যেন থেকেই যায়...

মন্তব্যের উত্তর তো দিই Smile

নতুন মন্তব্য করুন

এ তথ্য দেয়া আবশ্যক (অন্য কাউকে দেখানো হবে না)।
CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.
Image CAPTCHA
Enter the characters (without spaces) shown in the image.

সাম্প্রতিক মন্তব্য