আমার মা ভুলোমনা গোছের মানুষ। একদঙ্গল অপদার্থের সংসারে সারাদিন শতকোটি ঝামেলা একা সামলে চাকরিও একটা করেন। বিশাল পরিবারের মুরুব্বী হিসেবে সবার খোঁজখবরও তাকে রাখতে হয়। বয়সের ভারে নুয়ে পড়ার বহু আগেই শরীরে নানান উপসর্গ বাঁধিয়ে বসেছেন। তাই মায়ের ভুলোমনা স্বভাবকে আমরা বিশেষ আমল দিইনা। বরং এর সুযোগ নিই পুরোদমে। ছাত্রজীবনে এক পিকনিকের চাঁদা তিনবার চেয়ে তিনবারই পেয়ে গেছি, এমন নজিরও আছে। সেটা জানান দেয়ার পর আবার অপ্রস্তুত মুখে বলেও ফেলতেন, যাহ্ কী বলিস, তুই মজা করছিস না তো আমার সাথে?
দুধওয়ালার টাকাটা কোথায় যেন রেখেছেন, ভুলে যান। পেপারের বিল হারিয়ে বাবার মেজাজের ভয়ে চুপি চুপি হকার ছোকরাকে বাড়তি টাকা ধরিয়ে দিতে গিয়ে শোনেন সেটা ক'দিন আগে তিনি নিজেই চুকিয়েছেন। ওষুধ কিনতে হবে, প্রেসক্রিপশন হারিয়েছেন; তালা খুলতে হবে, চাবিটা এই মাত্র কোথায় রাখলেন ভুলে গেছেন; রান্নাঘরের তাক থেকে পাঁচফোড়নের কৌটোটা গায়েব হয়ে গেছে; দু'দিন হয়ে গেলো মোবাইল ফোনটা পাচ্ছেননা; চিরুনিটা জায়গামতো নেই, ব্যাংকের চেকবইটা উধাও-- এসব মায়ের জন্য অতি সাধারণ ঘটনা। দিনের মধ্যে অনেকবার তাকে দেখা যায় কীসব বিড়বিড় করছেন। কিছু বলছো মা? হাতের আঙুলের গাঁটে কী একটা হিসাবের ঈশারা করেন। এর মানে হচ্ছে কিছু একটা হারিয়েছে; ঊনিশবার ইন্নালিল্লাহ্ পড়ে সেটার খোঁজে আমল করে চলেছেন তিনি।
আমার মায়ের পরিবারে মেধাবী লোকজনের ছড়াছড়ি। মাধ্যমিক থেকে স্নাতকোত্তর পর্যন্ত একটানা প্রথম-দ্বিতীয় হয়ে যাওয়ার মতো একটা কঠিন ব্যাপার তারা ভাইবোনেরা মোটামুটি ডালভাতের পর্যায়ে নামিয়ে ফেলেছিলেন
। অতি সাধারণ নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারে তাদের অগ্রদূত হিসেবে মায়ের জীবনে ঝড়ঝাপ্টা-সংগ্রাম গেছে অনেক বেশী। নানান ঘটনা-দুর্ঘটনায় কাছের মানুষদের কাছ থেকেই আঘাত পেয়েছেন অনেকবার, হারিয়েছেন অনেক আপনজন; রোগেশোকে শারীরিক সুস্থতা-সৌন্দর্য হারিয়েছেন; কিছুটা স্মরণশক্তিও বিয়োজনের পাল্লায় যোগ হয়েছে। মোটকথা হারিয়ে-ফেলার অসাধারণ ক্ষমতায় মা বরাবরই আমাদের বিরক্তিকর রকমের বিস্ময়ের উৎস হয়ে থেকেছেন। এই সেক্টরে তার সঙ্গে পাল্লা দেয়ার মতো কেউ আছে, এ আমার সুদূরতম কল্পনার বাইরে ছিলো। তবে আজকের পত্রিকার একটা খবর আমার এতোদিনের ধারণাকে ধূলিসাৎ করে দিয়েছে।
শিরোনামটা এরকম: দেলোয়ারের সব হারিয়ে গেছে। জাতীয় সংসদ ভবন থেকে বিএনপির সাবেক চিফ হুইপ খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনের বাসভবনের জন্য নেয়া চারটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র, রঙিন টিভি, দুটি ফ্রিজ, ফটোকপিয়ার, দুটি কম্পিউটার, লেজার প্রিন্টার, রুম হিটার, বিভিন্ন ধরণের চেয়ার টেবিল, নামাজের চেয়ারটেবিল (এই কাজে চেয়ারটেবিলের ব্যবহার আগে জানা ছিলোনা, কতো অজানারে!), বাসার আসবাবসহ ২৮ ধরণের সামগ্রীর প্রায় সবই হারিয়ে গেছে৷ অষ্টম সংসদ শেষ হওয়ার পর সংসদ সচিবালয় থেকে এই মালামাল ফেরত চেয়ে দেয়া চিঠির উত্তরে জনাব দেলোয়ার এ তথ্য জানিয়েছেন। এতোকিছু হারালেও নিজেকে অন্তত হারিয়ে ফেলেননি, সেটা বোঝাতেই কিনা কে জানে, চিঠির সঙ্গে "এসব বক্তব্য সত্য" মর্মে একটি হলফনামাও দেলোয়ার সাহেব দাখিল করেছেন। কিছুদিন আগে পাজামার বাঁধন হারিয়ে বিখ্যাত এই রাজনীতিবিদকে এখন বোধহয় সর্বহারাই বলা চলে।
কোনকিছু হারিয়ে ফেলার সঙ্গে জড়িত অনুভূতিটির নাম বেদনা। সেলোয়ার-দেলোয়ারের সব হারানোর বেদনা তারই থাকুক, আমরা বরং কিছু গান শুনি।
হারিয়ে গ্যাছে খুঁজে পাবোনা-- বাংলা পপগুরু আজম খান
মন্তব্য
আগে বলো তুমি কৈ হারাইছিলা এ্যাত্তোদিন!!!!!!
-- তোমারে
কোত্থাও না
আহ, অনেকদিন পর লিখলি রে------
সেই ধার, সেই উইট---
জানি তুই কিসের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিস---তাই ঘন ঘন লেখার অনুরোধ করব না----কিন্তু মাঝে মাঝে নিজেকে অন্তত কিছুখনের জন্যে ভুলিয়ে দিতে হলে--এখানে লেখা দিস-----
অনিঃশেষ শুভ কামনা তোর জন্যে----
থ্যাংকস দাদা
হুম্মম্মম্মম্ম............ পৃথিবীতে কত ধরনের মা-ই তো থাকে !!!!! কেউ রাগী, কেউ সহজ, কেউ মিডিয়াম......... আপনার মা আসলেই একটু আলাদা !! তবে মা তো মা-ই !!!!!
মায়ের কি কোন তুলনা আছে নাকি ?
ধন্যবাদ তারিক। শুভকামনা।
আপু, অনেকদিন পর আপনার ব্লগে আসলাম। আমি একটা ব্লগ বানিয়েছি ওয়ার্ডপ্রেস-এ। ওখানে আপনার ব্লগের লিংক আছে। আমার ব্লগটা কেমন হলো জানালে খুশি হবো... কেমন আছেন আপনি?
অনেক ধন্যবাদ। লিংকটা দেবেন মনে করে।
কেমন আছ নুশু আপু ? অনেকদিন পর তোমার লেখা পড়লাম। স্বার্থপরের মতন তোমার খোঁজখবর-ও রাখা হয়নি। শরীর ভাল তোমার ? অপনা বাবু কেমন আছে ? লেখাটা পড়ার পর মনে হচ্ছে যেন হঠাৎ করেই শেষ হয়ে গেল। ভাল থেকো।
আমিও অনেকদিন তোমাদের কারও বাড়ীতেই যাইনি। অপনা ভালো আছে। ভালো থেকো টক্স।
দেলোয়ার, হাঁ হাঁ হাঁ । Our leaders are clowns ! Body, eye or word, they have no languages. But still we respect them for their ages and experiences and we will bring Change for this country through them, as sure as words before.
মজা লাগলো পড়ে। বিশেষ করে দেলোয়ারে যেসব জিনিস হারিয়ে গেছে সেগুলো জেনে।
সূক্ষাতিসূক্ষ জিনিসপত্র; হারিয়ে গেলে খুঁজে পাওয়া মুশকিল
ভালো লেগেছে
এই আরেফীনই তো?
ভালো থাকুন সবসময়।
ঘুরতে ঘুরতে আসছিলাম । এখনো পড়ি নাই তেমন কিছু । আবার পরে পড়বো । আসছিলাম, এই কথাখান জানাইয়া গেলাম খালি এইবার ।
কারে দেখতেসি!
পড়ার মতো কিস্যু নাই। তবু আসছেন, এইটাই বিরাট খুশীর খবর। ভালো থাইকেন।
নুশেরা'পু, কেমন আছেন?
আপনার বর্ষপূর্তি পোস্ট পড়লাম। কেন জানি মনটা খারাপ হয়ে গেলো। এখনো কেউ কেউ মনে রেখেছে, এটা ভাবতেই মন খারাপ হলো।
চারপাশে এত্তো এত্তো নিরর্থকতা,,, কিচ্ছু ভাল্লাগেনা।
পরিবার নিয়ে ভালো থাকুন সবসময়,,, শুভকামনা নিরন্তর...
- মুকুল
বুঝতে পারছি, সময়টা ভালো যাচ্ছে না হয়তো। সবকিছু ঠিক হয়ে যাক এই শুভকামনা জানাই।
আপু, কেমন আছেন? অনেকদিন সামুতে আপনাকে অনলাইনে পাইনা।
সামুকে, বিদায় জানিয়ে দিলাম। অযথা পোস্ট ডিলেট করে জেনারেল করে দেয়া এবং আমার এক বন্ধু সেটা নিয়ে পোস্ট দেয়ায় তাকে ব্যান করা, এত দিনের ব্লগ জীবনে এটাই প্রাপ্তি।
আপনার সাইটে মাঝে মধ্যে এসে আপনাকে জালিয়ে যাবো।
ভালো থাকবেন।
অপরাজিতা- দূর্ভাষী জুটি আমার খুবই প্রিয়। আপনিসহ অনেকের ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষ যা করেছে তা একেবারেই অযৌক্তিক ও অন্যায়। তাদের বোধোদয় না হলে এভাবে অনেকে চলে যাবে। ভালো থাকবেন। অপরাজিতাকে আমার শুভেচ্ছা জানাবেন।
ধন্যবাদ আপু। বিজয় দিবসের অনেক অনেক শুভেচ্ছা।
ঘুরতে ঘুরতে এখানে এসে ঠেকে গেলাম। এত সুন্দর এইখানে এর আগে আরেকবার এসেছিলাম। মুগ্ধতা রেখে গেলাম। শুভেচ্ছা আর শুভকামনা রইল ভাঙ্গনের পক্ষ থেকে ।
ঘোরাঘুরিকে প্লাস। রুকসানা আপা ভালো থাকুক
লেখাটা পড়ে খুব মজা পাইলাম। নুশেরা আপু ভালো আছেন?
নতুন মন্তব্য করুন