গান-গল্পের চরিত্ররা-১
গান-গল্পের চরিত্ররা-২
কথা ও সুরে কিছুটা নচিকেতা-ঘেঁষা শিলাজিত কিন্তু অঞ্জন বা নচিকেতার মতো জনপ্রিয় নন; যদিও পাহাড়ের পটভূমিতে সাঁওতালী সুর ব্যবহার করে বেশ কিছু স্বতন্ত্র ধারার গানও গেয়েছেন তিনি। কিছু গানে আবার চেনাজানা নাগরিক জীবনের গল্প বলেছেন; নামধারী চরিত্ররাও আছে তাতে। পলিটিক্যাল সায়েন্সে অনার্স নিয়ে বিল ক্লিনটন, অথবা ফিলোসফি পড়ে হোমার, কিংবা ইংরেজি পড়ে শেক্সপীয়রের চেয়ে বড় ইংরেজ হবার সম্ভাবনা না থাকায় কলেজে উপস্থিতির কারণ হিসেবে সুদেষ্ঞাকেই দেখাচ্ছেন শিলাজিত।
আমি সুদেষ্ঞাতেই অনার্স
ওটাই আমার মেইন কোর্স
ওটাই আমার বেঁচে থাকার আল্টিমেট সোর্স।
শেলি-কিটস-চসার-মার্কস-লেনিন-- সবাই এসেছেন এই গানে সুদেষ্ঞার কাছে পরাজিত হতে। তার পরপরই পাঠ্যবিষয় হিসেবে সুদেষ্ঞার যৌক্তিকতা বোঝাতে গল্পের চরিত্ররাও হাজির।
ইকনমিক্সে অনার্স নিয়ে বুবুন বেচুবাবু
ফিলসফির মহুয়াদি টাইপ করেই কাবু
এরম আছে আমার কাছে হাজার উদাহরণ
তার চেয়ে দাদা অনেক সরল আমার সমীকরণ।
"বেতাল" গানটিতে এইসব বন্ধুদের পাশাপাশি সুমন-নচির কথাও আছে।
"চলো মামা পালিয়ে" গানটিতে নাগরিক জীবনের অপ্রাপ্তি-হতাশা এসেছে। শিশুচরিত্রের কণ্ঠ জুড়ে তার মুখ থেকেও পাহাড়ের সাঁওতাল-পল্লীতে পলায়নেচ্ছু মনের ভাবনাকে ফুটিয়ে তুলেছেন শিলাজিত। লিরিকের ঘন সন্নিবিষ্ট বুননে ছেলেধরা, নেতা থেকে সাঁওতাল বউ বা বুড়ো আংলাও আসেন এই গানে। "চূর্ণি তুমি সবার তবু আমার তুমি নও" গানের শিরোনাম চরিত্রের নামেই।
ঝিমটি তুই বৃষ্টি হতে পারতিস
এই মেঘলা দুপুরে কতো কাছাকাছি থাকতাম
ঝিমটি তুই বৃষ্টি হতে পারতিস
ঝরে পড়তিস টিপ টুপটাপ গায়ে মাখতাম
--বৃষ্টিপ্রিয় শ্রোতার পছন্দের গান। পাহাড়ী সুরের ছোঁয়াও আছে; শিলাজিতের অনেক গানেই যার উপস্থিতি মেলে। এক্স ইক্যুয়ালসটু প্রেম ধরে নিয়ে জীবনের জটিলকুটিল ফ্যাক্টরকে সমীকরণে ফেলার অনুপ্রেরণাদায়িনী ঝিমটি চরিত্রটি শ্রোতৃপ্রিয়তা পায়; আবারও ফিরে আসে শিলাজিতের গানে।
কলকাতার ব্যান্ড "চন্দ্রবিন্দু"র গানে নিজস্বতা প্রবল। সিরিয়াস মেয়েটিকে অথবা ক্লাস টু'র বিচ্ছুর বাবামাকে "গান ভালবেসে গান" বললেও তাদের নাম বলা হয়না; এই গানে স্বনামে চলে আসেন "ভূগোলের ফাঁকে উঁকি মারা" শাহরুখ খান! "মন" গানটিতে হাওয়ায় পাওয়া নামের বন্ধুর নাম অব্যক্তই রয়ে যায়; যেমন অপ্রকাশিত "বন্ধু তোমায় এ গান শোনাব বিকেল বেলা"র বন্ধু। "কন্ডাকটর", "রিকশাওয়ালা", "আনন্দ সেন বই পড়তেন, আনন্দ সেন প্রোটিন খেতেন", "ব্রহ্মা জানেন গোপন কম্মোটি", এমন সব গানে প্রথম কলিতেই চরিত্র উপস্থিত স্বনামে। "কন্ডাক্টর" গানে আছে শান,মমতাশংকর,স্পিলবার্গ থেকে জুরাসিক পার্কের ডাইনোসর পর্যন্ত।
রূপঙ্করের ভীষণ রোম্যান্টিক গান "চলে এসো আজ এ রাতে"র প্রিয়তমা গায়কের গিটারেও বাজে। তবে সম্বোধনের ধরণ থেকে স্পষ্ট হয়না তার নাম প্রিয়তমাই কিনা। আরেকটি গানে অবশ্য চরিত্র স্বনামেই উপস্থিত: "রুপাঞ্জনা তোমার মুখে কান্নার গান শুনব না"।
পাগলী তোর জন্য দিগন্তে পাখির উড়ান
পাগলী তোরজন্য জয় গোস্বামী শব্দ কুড়ান
পাগলী তোর জন্য সুর খোঁজেন আলাউদ্দিন খান
পাগলী তোর জন্য গান গাইছেন পল রফসন
সাদ্দাম, রববীন্দ্রনাথ, তালিবান, ফিদা হুসেন, গডার-- এঁরাও এসেছে প্রতীক চৌধুরীর "পাগলী তোর জন্য" গানে।
লোপামুদ্রার গানে নামবিহীন বা নামবাহী চরিত্ররা কমবেশী রূপক হিসেবেই এসেছে। যেমন "হাল্লার রাজা" গানে এসেছে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ। তবে সুরারোপিত কবিতায় যে চরিত্রটিকে লোপামুদ্রা অক্ষয় করে রেখেছেন সে হলো বেণীমাধব। জয় গোস্বামীর মালতীবালা বালিকা বিদ্যালয় কবিতা অনুসরণ করে অনন্য কণ্ঠে লোপামুদ্রা গেয়ে চলেন:
বেণীমাধব বেণীমাধব তোমার বাড়ী যাবো
বেণীমাধব তুমি কি আর আমার কথা ভাবো?
মালতীস্কুলের ডেস্কে বসে অংক করা কিশোরী মেয়েটি সময়ের তোড়ে ভেসে এখন পাড়ার সেলাই দিদিমণি। তবু ফেলে আসা দিনের ভাবনায় দুর্মর স্বপ্নসাধে এখনো উঁকি দেয় সুলেখাদের বাড়ীতে আলাপ হওয়া শহর থেকে বেড়াতে আসা বেণীমাধব; যার সঙ্গে প্রেমিকাকে দেখে মনে হয় "আলোর নীচে; অপূর্ব সেই আলো"; অশ্রুধারা গোপন করা ক্ষুদ্র দোকানকর্মী পিতার কন্যার কণ্ঠে উচ্চারিত হয়, "ওদের ভালো হোক..."।
প্রথম পর্বে নারীকণ্ঠে গীত গানে নামবাহী চরিত্রের ঘাটতি থাকার বিষয়টি এসেছিল। সত্তর দশকে আশা ভোঁসলের চটুল গান "ইনা-মিনা-ডিকা" অবশ্যই ব্যতিক্রম। যদিও এগানের চরিত্ররা পুরুষ নন, নারীই। অরুন্ধতী হোম চৌধুরীর "চন্দ্রদূতী রাত্রি এসে বলে কোথায় চন্দ্রাবতী"তেও ঐতিহাসিক একটি নারী-চরিত্রের দেখা মেলে। ফরিদা পারভীনের বহুশ্রুত গানটিতেও আছে মল্লিকা নামের নারীচরিত্রঃ
তোমরা ভুলেই গেছ মল্লিকাদির নাম
সে এখন ঘোমটা পরা কাজল বধূ দূরের কোন গাঁয়
যেদিন গেছে সেদিন কি আর ফিরিয়ে আনা যায়!
বেণীমাধব ছাড়া নারীকণ্ঠের গানে পুরুষচরিত্র কি তবে নিজনামে কখনো আসেনি? এসেছে। এই বাংলাদেশেরই একটা গানের কথা বলা যায়। সত্তরের শেষ বা আশির গোড়ার দিকের গান, মিতালী মুখার্জির কণ্ঠে:
ভুলে গেছে শান্ত
ভুলিনি আমি তো
ফিরে এসে
দ্যাখেনি সে
এই আমি সেই আমি রয়ে গেছি তারই তো।
নীল খামে চিঠি লিখে নীলা নামে ডাকার গল্পও আছে এই গানে!
এরকম বিরল ব্যতিক্রমের বাইরে নারীকণ্ঠে পুরুষচরিত্র গীত হয়েছে শ্যাম-কালা-কৃষ্ঞ-বন্ধু-বন্ধে-মাঝি-নাইয়া'র মতো সাধারণীকৃত সম্বোধনে (প্রথম পর্বে আলোচিত)।
উপমহাদেশের চলচ্চিত্রে গানের ভূমিকা নতুন করে বলার কিছু নেই। তাই বাংলা চলচ্চিত্রের গানে চরিত্রের নাম আসাটা অস্বাভাবিক কিছু নয়; বিশেষতঃ যেখানে প্রধান চরিত্র বা চরিত্রদ্বয়ের নামেই ছবির নাম রাখা হয়। পঞ্চাশ বা ষাটের দশকে নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের গল্প নিয়ে তৈরী সিনেমায় মান্না দের গাওয়া গান গল্পটিকে চিনিয়ে দেয়:
পটলডাঙার আমরা কজন বিখ্যাত চার মূর্তিমান
ক্যাবলা হাবুল টেনিদা আর
লিকলিকে এই প্যালারাম।
সত্তর দশকের কলকাতার সিনেমার একটি গান; যেখানে তৎকালীন নাগরিক আধুনিকতায় টেলিফোনের আলাপে পাত্রপাত্রীর কথা এসেছে এভাবে: একপক্ষ বলছে "নাম বলোনা", ওপার থেকে জবাব মিলছে "যার নাম তার মুখে ভাল লাগেনা"! কাছাকাছি সময়ের গান "দ্যাখোনা চেয়ে ও মিষ্টি মেয়ে"তে মেয়েটির নাম অনুমানের চেষ্টা করছে ছেলেটি: "... মিতালী, গীতালি?" সঞ্চারীতেই উত্তর আসে, " না না, আমি মা কালী!" "মাদার" চলচ্চিত্রের গানটি মনে পড়ে,
আমার নাম অ্যান্টনি কাজের কিছু শিখিনি
লার্নিং কিংবা সিংগিং অর ডান্সিং
আমি আজকের দুনিয়াতে গুড ফর নাথিং।
সমান্তরালে শোনা যাক বাংলাদেশের সিনেমার গান। সত্তর দশকের চটুল গানে খুরশীদ আলম অপরিহার্য।
চুমকি চলেছে একা পথে
সঙ্গী হতে দোষ কি তাতে
হার মেনেছে দিনের আলো
রাগলে তোমায় লাগে আরও ভালো; অথবা,
সুমন-রাজন মোহন বন্ধু আমরা তিনজন
ভালবাসার জিঞ্জির-বাঁধা আমাদের জীবন; কিংবা
আমার নাম সুমন
এমন একটা মন
আজো মেলেনি
ভালবাসেনি
তাই আমি একলা এখন
ইত্যাদির রিমেকেও চুমকি, সুমনরা সমান জনপ্রিয়। সুজন-সখী, নয়ন-মণি নামগুলো ছবি ও গান-- উভয়ের চরিত্র হিসেবেই বেঁচে আছে।
আশির দশকের ছবি "পুনর্মিলন"-এ নতুন উন্মাদনা নিয়ে সঙ্গীতজগতে আগত কুমার বিশ্বজিত অতিথি চরিত্রে নায়ক-নায়িকার মুড তৈরীর প্লটে গান শোনান,
চন্দনাগো রাগ কোরোনা
অভিমান করে বলো আর কী হবে
সময় চলে যায় মন শুধু বলে যায়
তৃষ্ঞার জল নিয়ে এসোনা তবে...
"তিন কন্যা" নামের ছবিতে অভিনয় করা তিন বোন সুচন্দা-ববিতা-চম্পার নাম এসেছে তার গানে। গায়ক কুমার শানু তখনও বাংলাদেশে নবাগত গায়ক।
স্টিভি ওয়ান্ডারের বিশ্ববিখ্যাত গান "আই লাভ ইউ মোর দ্যান আই ক্যান সে" এর হুবহু সুরের গানটিতে এসেছে রুবি নামের এক চরিত্র:
ও হো ও রুবি
ভালোবাসি খুবই...!
"বেদের মেয়ে জোসনা আমায় কথা দিয়েছে", "আমি আশিক তুমি প্রিয়া", "প্রেম-প্রীতি দুজনে", "হৃদয়ের কথা" ইত্যাদি গানে পাত্রপাত্রীর নাম এসেছে; এসেছে সিনেমার নামেও। একইভাবে নব্বইয়ের দশকে আইয়ুব বাচ্চু-কনকচাঁপা জুটির বিখ্যাত গান "সাগরিকা বেঁচে আছে তোমার ভালবাসায়" এবং তারও কিছু পরে মমতাজের গাওয়া "খায়রুন লো তোর লম্বা মাথার কেশ" গানদুটোতেই স্পষ্ট সংশ্লিষ্ট ছবির নাম।
ফোক আঙ্গিকের গানের বহুশ্রুত চরিত্র জরিনা। গানটি রথীন্দ্রনাথ রায়ের কণ্ঠে:
আমি কি তোর আপন ছিলাম না রে জরিনা
ছোট্টবেলায় গাছতলাতে পুতুল খেলার ছলনাতে
আম কুড়াইতে যাইতাম দুজনা।
জরিনা চরিত্রের কাছ থেকে আসে এর জবাব; যেখানে জানা যায়, আপনজনটির নাম চানমিয়া।
চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গানে শেফালী ঘোষ আর তাঁর সঙ্গীতজুটি শ্যামসুন্দর বৈষ্ঞবের গানগুলো মূলতঃচরিত্রনির্ভর। পাঞ্জাবীওয়ালা, সাম্পানওয়ালা, পানওয়ালা, রিকশাওয়ালা, এমনকি হাতে নুন নিয়ে বরই খাওয়া নাতিন পর্যন্ত। উত্তরবঙ্গের গানে গাড়িয়ালভাই, ভাটি অঞ্চলে মাঝি বা নাইয়া-- আঞ্চলিক গানের পরিচিত চরিত্র।
বীর মুক্তিযোদ্ধা আজম খানের হাত ধরে সদ্যস্বাধীন বাংলাদেশের সঙ্গীতজগতে পপের প্রবেশ ঘটে। গানের কথায় ঢুকে পড়ে নামধারী চরিত্ররা।
চুপ চুপ চুপ অনামিকা চুপ কথা বোলোনা
তুমি আমি এখানে কেউ জানেনা... অথবা
"ওরে সালেকা ও রে মালেকা ওরে ফুলবানু পারলিনা বাঁচাতে" কিংবা "আলাল ও দুলাল" গানের চরিত্রগুলো আজম খানের মতোই জনপ্রিয়তা পেয়ে যায়।
স্বল্পায়ু সঙ্গীতজীবনে গিটারিস্ট-কণ্ঠশিল্পী শেখ ইশতিয়াক এক গানেই নীলনয়না মেয়েটিকে সুপরিচিতি দিয়ে ফেলেছেন-- "নীলাঞ্জনা ঐ নীল নীল চোখে চেয়ে দেখোনা...।" গুণী সুরকার লাকী আখন্দের গানে নামবাহী নারীচরিত্র এসেছে কয়েকটি। "নীলা, কেন চোখ দুটো আঁখিজলে উঠেছে ভরে", "সুমনা মনের মেয়েটির নামটিও সুমনা", "মামণিয়া--- ও মায়াবিনী চোখে চেয়ে থেকে থেকে বেলা যে আর কাটেনা" এমন কিছু উদাহরণ।
"ময়না, এখনো কি আমার জন্য রাত্রি জাগেনা"-- আইয়ুব বাচ্চুর সঙ্গীতজীবনের প্রথম দিককার গান; তখন তিনি সোলসের বাদক। পরবর্তীতে এলআরবি ব্যান্ডের কর্ণধার হিসেবে প্রচুর জনপ্রিয় গানের মালিকানা রয়েছে তার। মাধবী, ঊর্মিলা চৌধুরীর মতো নামধারী চরিত্ররা এসেছে তার গানের গল্পে।
দেয়াল ঘড়িতে এগারটা বেজে কুড়ি
জানালার পাশে রাত জাগে একা উর্মিলা চৌধুরি
উপন্যাসের পাতায় যাখন এই কথা গুলো পড়ি
তখন আমার বয়স হয়তো, উনিশ কিংবা কুড়ি।
আইয়ুব বাচ্চুর সুরে কুমার বিশ্বজিতের গাওয়া একটি গানে আছে সনামী চরিত্র, আছে গল্পও:
শ্রীলা তোমারই লেখা একান্নটি চিঠি ফিরিয়ে দিলাম
তোমারই হাতে
তারায় ভরা রূপাঞ্জলি রাতে।
"চন্দনা"র কথা আগেই বলা হয়েছে; এছাড়া বিশ্বজিতের একটি গানে ঘরের দেয়ালে ছবি হয়ে সুচিত্রা সেন-এর থাকার কথা আছে। আরেকটি গানে প্রিয়াকে প্রশ্ন ছুঁড়ে মিলিয়ে নিচ্ছেন চেনাজানা সব নাম; তবু শেষ পর্যন্ত প্রশ্নের উত্তর মেলেনি:
কী নাম বলোনা তোমার
মৌসুমী নাকি মিলি
নাকি তুমি পারমিতা
শবনম শিউলি?
আরেকটি গানে ঐতিহাসিক চরিত্রের নাম এসেছে একেবারেই অন্য কারণে: তোমার সাথে দেখা না হলে মীরজাফরের বংশটাকে এত কাছে থেকে দেখা হতো না---...
তখন মাকসুদ ফিডব্যাকের মূল গায়ক। "মৌসুমী কারে ভালোবাসো তুমি" গানটি ব্যাপকভাবে শ্রোতাপ্রিয় হয়। পরবর্তীতে এর সিক্যুয়েল তৈরি করে ফিডব্যাক; আমাদের দেশে কোন গানের পরবর্তী পর্ব তৈরীর চর্চাটি সম্ভবত মৌসুমীকে দিয়েই শুরু হয়। প্রথম পর্বে মৌসুমীর প্রতি গায়কের প্রেমকে দ্বিপাক্ষিক বলে মনে হয়না; দ্বিতীয় পর্বে এসে মৌসুমী হয়ে যায় আরও দূরের কেউ।
কার বুকের আলিঙ্গনে লুকিয়ে তুমি ভাবছোকি আমার কথা
কার চোখে চোখ রেখে তোমার মনে পড়ছেকি আমার কথা
না কোনও বিরহের গান গেয়ে তুমি দিচ্ছো সান্ত্বনা মনে
লক্ষ স্মৃতিকে আঁকড়ে ধরে তুমি করছো অনুতাপ
ও মৌসুমী, বলো কার তুমি
নাকি ভুল হয়ে গেলো আমার!
"আজ তোমার চিঠি যদি না পেলাম" গানটিতে হাস্যরস জুড়ে দিয়ে পরের লাইনেই এসেছে-- "নাকি ভেবে নেব ডাকপিয়নের অসুখ হয়েছে"।
সিক্যুয়েল প্রসঙ্গে আরেকটি গানের উল্লেখ করা যেতে পারে। "ও সখিনা গেছস কিনা ভুইলা আমারে"--- গণসঙ্গীতশিল্পী ফকির আলমগীর এই গানটির একাধিক পর্ব গেয়েছেন। প্রথম পর্বে "আমি এখন রিকশা চালাই ঢাকা শহরে"। দ্বিতীয় পর্বে "রিকশা এখন চালাই নারে ঢাকা শহরে"। দেশ-বিদেশের রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব (ভাসানী, ম্যান্ডেলা প্রমুখ), মানবসেবী ব্যক্তিত্ব (মাদার তেরেসা) এসেছেন তার গানে। মে দিবসের প্রেক্ষাপটে "নাম তার ছিল জন হেনরি" আরেকটি উল্লেখযোগ্য গান।
অকালপ্রয়াত সঞ্জীব চৌধুরী সাম্প্রতিক সময়ের বাংলা গানে অন্যতম সেরা গীতিকবির স্বীকৃতি পেতে পারেন অনায়াসে। তার ব্যান্ড দলছুটের গানে দিনাজপুরের সেই নির্যাতিত কিশোরীর জন্য আর্তনাদ ফুটে ওঠে: আহ্ ইয়াসমীন! মাহমুদুজ্জামান বাবুর "রাজা যায় রাজা আসে" গানটির প্রেক্ষাপটও কাছাকাছি। পুলিশি হেফাজতে মৃত্যুবরণের পর সৎকারের জটিলতা তৈরির জন্য মেয়েটির ধর্মপরিচয় নিয়ে উদ্দেশ্যমূলক টানাহেঁচড়া চলে। বাবু যথার্থই গেয়েছেন:
তবু একদিন খবর আসে
নিরাপদ হেফাজতে
একজন সীমা চৌধুরী
নিরাপদে মারা যায়...
সঞ্জীবের "স্বপ্নবাজী" গানটিতে আছে কর্নেল তাহেরের কথা, তাজুল ইসলাম এবং আরো ৩০০ টি লাশের কথা।
"আকাশনীলা তুমি বলো কীভাবে আমার শূণ্য মনে আলো ছড়াবে"-- খালিদের গাওয়া গানে আকাশনীলা চরিত্রটি সেভাবে জনপ্রিয় হয়নি, যতোটা হয়েছে তার সরলতার প্রতিমা। দুটোর একটাতেও অবশ্য সে অর্থে গল্প নেই। "জীবনমুখী" ধারার গায়ক প্রীতমের গানেও নামধারী চরিত্র আছে; এমনকি একটি গানে নিজ কণ্ঠে নচিকেতার গায়কীর ছাপ প্রসঙ্গে তিনি গেয়ে ওঠেন, "আমি গাইলে নচির মতো লাগে...।" সাম্প্রতিক সময়ে স্বরচিত কথা-সুরে গান করছেন সায়ান; তার গানে রবি-নজরুল, খালেদা-হাসিনারা চরিত্র হিসেবে এসেছেন।
তদানীন্তন ব্যান্ড আর্ক (এখন স্বাধীনতা?) এর বিখ্যাত গান, হাসানের গাওয়া "এতো কষ্ট কেন ভালবাসায়"তে উজ্জ্বল নিয়ন আলো আর সানাইয়ের সুরে একটু একটু করে প্রিয়ার দূরে সরে যাবার গল্প আছে তবে চরিত্রের নাম নেই। আরেকটি গানে অবশ্য উপস্থিত সুইটি নামের কেউ। বাপ্পা মজুমদারের গানে অহনা (অহনা জানে গহনার দাম বাজারে), অধরা(অধরা আসে নীরব দুটি পায়ে) নামবাহী চরিত্র। জেমসের গানে পোশাকশিল্পের শ্রমিকের সাধারণ নাম সেলাই-দিদিমণি খুব সম্ভবত জয় গোস্বামীর সেই কবিতা থেকেই নেয়া। নামবাহী চরিত্র আছে "ও বিজলী চলে যেওনা", "নাগর আলী", "মীরাবাঈ", "মান্নান মিয়ার তিতাস মলম", "হুমায়রার নিঃশ্বাস চুরি হয়ে গেছে" ইত্যাদি গানেও। নতুন প্রজন্মের শিল্পী মাহাদীর গাওয়া গান "তুমি বরুণা হলে আমি হবো সুনীল"-এ এসেছে বিখ্যাত কবির বিখ্যাত চরিত্রের নাম। রাশেদের গান "ঐ আকাশের তারায় তারায়" আছে হারিয়ে যাওয়া মাকে খোঁজার চিরকরুণ গল্প। এই প্রসঙ্গে বলতেই হয় হেমন্ত মুখার্জি আর শ্রাবন্তী মজুমদারের দ্বৈতকণ্ঠের বিখ্যাত গান "আয় খুকু আয়"এর কথা। যার উত্তর দিতেই যেন মা-মেয়েকে নিয়েও গান চলে আসে,
তুমি আমার মা আমি তোমার মেয়ে
বলোনা মা কী পেয়েছো আমায় কোলে পেয়ে।
মেয়ের ভূমিকায় এখানেও শ্রাবন্তী; সঙ্গে সন্ধ্যা মুখার্জি।
তবে সন্তানের ভূমিকায় লিরিকের আকুতি সবকিছুকে ছাপিয়ে যায় মা আর বাবাকে নিয়ে গায়ক জেমসের দু'টো গানে। "বাবা কতোদিন কতোরাত দেখিনা তোমায়"-এর আর্তনাদ শ্রোতাকে কাঁপিয়ে দেয়। মাকে নিয়ে গানটি স্পর্শ করে গভীরতম অনুভবকে--
রাতের তারা আমায় কি তুই বলতে পারিস
কোথায় আছে কেমন আছে মা
ভোরের তারা রাতের তারা মাকে জানিয়ে দিস
অনেক কেঁদেছি আর কাঁদতে পারিনা...
মন্তব্য
সুন্দর হইছে
পোষ্ট ষ্টিকি করা হোক
এইদিন দিন না আরও দিন আছে
joma kore rakhlam. sob skshate porbo.
kemon acho nushera?
valo theko onek.
হামিদা তোমাকে দেখে প্রতিবারই অবাক হই। তোমার নতুন লেখা কবে পাবো? ভালো থেকো।
অসাধারণ!
http://banglablogtips.blogspot.com
ধন্যবাদ AR
নুশেরা,
যথারীতি দূর্দান্ত লেখা। লেখার প্রেক্ষাপট ও বিস্তৃতি বিশাল। সাম্প্রতিক বাংলা গানের এরকম একটা তুখোড় আলচনার দরকার ছিল।
এই প্রায়-অসম্ভব কাজটি করতে তোকে কী পরিমান কষ্টের মধ্যে যেতে হয়েছে, তা সহজেই অনুমেয়। কিন্তু আমি এইটা দিব্যি বলতে পারি যে এই কষ্ট তোর গায়েই লাগে নি। কারন?
কারন---তুই আসলেই গান খুব ভালবাসিস। সঙ্গীত তোর second nature!
যদি রাগ না করিস, তাহলে দুইটা জিনিস একটু উল্লেখ করতে চাইঃ
১। 'আমার নাম এন্টনী' এইটে খুব সম্ভব এন্টনী ফিরিঙ্গির গান নয়।
http://loveukolkata.blogspot.com/2009/04/antony-firingi-1967-mp3-songs.html
এই লিঙ্কে গেলে ঐ সিনেমার গান গুলো দেখতে পাবি।
২। কুমার বিশ্বজিতের 'মীরজাফর' গানের কথাটা একটু ঠিক করে দিস। গানের 'আসল' বাণী হলঃ
তোমার সাথে দেখা না হলে
মীরজাফরের বংশটাকে এতকাছে থেকে দেখা হতো না---
হুঁহ্! রেগে একেবারে টং হয়ে গেছি। "অ্যান্টনী ফিরিঙ্গি"র গান না হলে... ... তবে কি "চৌরঙ্গী"র? ...
পেয়েছি। সিনেমার নামটা হবে "মাদার"
মাঝে মাঝে হাত দুটো নিশপিশ করে,
চকচকে চোখ থেকে, স্বপ্ন ছিনিয়ে এনে,
ছড়িয়ে ছিটিয়ে দেই এখানে সেখানে।
-------শিলাজিত
it's an wordy hurry, buddy !
কী খবর নুশেরা'পু? দিনকাল কেমন কাটছে?
কেন জানি পুরোনো থীমটাই ভাল্লাগছিলো বেশি!
আরে মুকুল যে! এইতো কেটে যাচ্ছে একরকম। আমারও আগের থিমটাই বেশী পছন্দের ছিলো। শুভকামনা রইলো।
kemon asen ???
ব্যাপক ভালো
chomotkar shob gaan mone porlo...onek porichito onek notun...dhonnobad apu
আপনাকেও ধন্যবাদ
গুগলে সার্চ দিয়েছিলাম অন্য একটা কন্টেন্ট নিয়ে। সেখান থেকে আপনার সাইটের লিঙ্ক পাব,এটা ধারণাও করি নি। ভালো লাগলো। আমি কিন্তু সামহোয়ারইনে আপনার ভক্ত!!
ভালো থাকবেন।
মিশুককে স্বাগতম। আপনার ব্লগ-লিঙ্কটা দিয়ে যেতেন
ভালো থাকুন আপনিও।
কী অদ্ভূত মিষ্টি একটা লেখা!!
পুরাই মন ছুঁইয়ে দিয়ে গেলো...
মাহমুদ ফয়সাল
ধন্যবাদ ফয়সাল।
অনেকদিন পাড়া বেড়ানো হয় না, তোমার নতুন লেখা পড়তে যাবো শিগগিরই।
নতুন মন্তব্য করুন